নিজস্ব প্রতিবেদক | শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) আবারও ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী দেবজ্যোতি সাহা অর্জুন। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজের অনুমোদন, বিল ছাড় এবং ঠিকাদারি সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
সাংবাদিক অনুসন্ধানে জানা যায়, ইইডির একাধিক প্রকল্পে ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে “অফিস খরচ” নামে অর্থ আদায় করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, দেবজ্যোতি সাহা অর্জুন এসব লেনদেনে সরাসরি ভূমিকা রাখতেন। নির্ধারিত অঙ্কের টাকা না দিলে কাজের ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হতো বা বিল ছাড়ে অযৌক্তিক বিলম্ব সৃষ্টি করা হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার জানান, কাগজপত্র সব ঠিক থাকার পরও হঠাৎ নতুন আপত্তি তোলা হতো। পরে ইঙ্গিত দেওয়া হতো, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। টাকা না দিলে বিল আটকে রাখা বা কাজের অনুমোদন স্থগিত রাখার অভিযোগও উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব লেনদেন এককভাবে নয়, বরং একটি অঘোষিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে দপ্তরের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা এবং বাইরের দালালচক্র জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইইডিতে বদলি-বাণিজ্য, দরপত্র সিন্ডিকেট ও ঘুষের অভিযোগ শোনা গেলেও কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনিয়ম শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষা অবকাঠামোর মান ও প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতার ওপর। স্থানীয় স্কুল ও কলেজের নতুন ভবন, শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ এবং ল্যাব স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এক প্রকল্প ঠিকাদার বলেন, অনিয়মের কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে এবং ঠিকাদারদের আর্থিক চাপ বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর।
এ বিষয়ে দেবজ্যোতি সাহা অর্জুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লিখিত অভিযোগ ও প্রমাণ পেলে তা তদন্তের আওতায় আনা হবে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের কাজ ও আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণে কার্যকর তদারকি না থাকায় একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। অতীতেও ইইডিতে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। ফলে অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এক অভিভাবক জানান, নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অথচ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ে ব্যস্ত।
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ঘুষ ও সিন্ডিকেটের কারণে শিক্ষা অবকাঠামোর গুণগত মান ক্রমেই কমে যাচ্ছে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্প অডিট এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।