পিন্টু শেখ: ফায়ার সার্ভিসের সাধারণ একজন গাড়িচালক। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে জরুরি মুহূর্তে মানুষের বিপদে ছোটাই যাঁর কাজ হওয়ার কথা ছিল, তিনি নিজেই গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার এক অদেখা সাম্রাজ্য! রাজধানীজুড়ে একাধিক বাড়ি, কোটি টাকার জমি আর বদলি-বাণিজ্যের সিন্ডিকেট—ড্রাইভার মোঃ সাখাওয়াত হোসেনের এমন অবিশ্বাস্য রূপকথার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশ পেতেই তোলপাড় শুরু হয়। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল এবার অন্তত থলের বিড়াল বের হবে, হবে কঠোর শাস্তি। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো ঘটনা—কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা দুদকের আইনি ঝামেলা ছাড়াই, পুরো পেনশন সুবিধা হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে দেওয়া হলো ‘রাজকীয় প্রস্থান’।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আদেশে সুনামগঞ্জের শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের চালক সাখাওয়াতকে ‘জনস্বার্থে’ চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়েছে। আদেশের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো—তাঁকে কোনো শাস্তি তো দেওয়া হয়ইনি, উল্টো স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তিনি নিয়ম অনুযায়ী অবসরকালীন সব টাকা-পয়সা ও সরকারি পেনশন সুবিধা পাবেন।
আইনের ফাঁক গলে ‘সেফ এক্সিট’
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন বা দুর্নীতির প্রমাণ মিললে সঙ্গে সঙ্গে বিভাগীয় তদন্ত ও দুদকে খবর দেওয়া বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ সাখাওয়াতের বেলায় সব নিয়ম একপাশে সরিয়ে রাখা হলো। সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারা ব্যবহার করে তাঁকে এমনভাবে সরিয়ে দেওয়া হলো, যাতে তিনি সব তদন্তের হাত থেকে পুরোপুরি বেঁচে যান। প্রশ্ন উঠেছে, সচিবালয় ও প্রশাসনের কোন অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে এই ‘নিরাপদবিদায়ের’ আয়োজন করা হলো?
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য ও রহস্যময় নীরবতা
অভিযোগের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরের সর্বশেষ অবস্থান জানতে পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সদরদপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে এভাবে নীরবতা পালন করা এবং পুরো দায় মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি এই রাজকীয় অবসরের পেছনের গোপন চুক্তিকে আরও বেশি সন্দেহজনক করে তুলেছে।জনগণের টাকায় দুর্নীতির পুরস্কার?
জরুরি সেবার মতো সংবেদনশীল জায়গায় দিনের পর দিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে একজন চালক এত সম্পদ বানালেন, তার বিচার তো হলোই না; বরং সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় এখন সারাজীবন পেনশন ভোগ করবেন তিনি। সুশীল সমাজের মতে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পর তদন্ত না করে অবসরে পাঠানো মানে অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে পুরস্কৃত করা।
অবসরের প্রজ্ঞাপন সই হলেই কি অপরাধের সব দায় মুছে যায়? সচেতন মহলের দাবি একটাই—অবসরে পাঠালেও চালক সাখাওয়াতের শতকোটির অবৈধ সম্পদ এবং তাঁকে আড়াল করার নেপথ্য কারিগরদের খুঁজে বের করতে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করতে হবে।এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের প্রশাসন ও অর্থ শাখায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও কেউ মন্তব্য জানাননি।
এমন একজন দুর্নীতিবাজকে সেফ এক্সিট দিতে কে বা কারা জড়িত? তাদের তথ্য নিয়ে থাকছে আগামী পর্ব