নিজস্ব প্রতিবেদক:
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর মহাপরিচালক (ডিজি) পদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক (মাধ্যমিক) খান মাইনুদ্দিন সোহেল। নতুন পদে বসার সঙ্গে সঙ্গেই তার অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে আসছে, যা প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে তৈরি করেছে অস্বস্তি ও প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, ডিজি হওয়ার আগেই সোহেল মন্ত্রণালয় ও প্রভাবশালী মহলে সক্রিয় তদবীর চালিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, শিক্ষা প্রশাসনে গড়ে তোলা দীর্ঘদিনের আর্থিক নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সুবিধা নিয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবু নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক থামেনি।
এর আগে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল বদলি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। প্রায় ১,৭০০টি বদলির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, যেখানে তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ ছিল। সেই ঘটনা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা হলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মাউশির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নতুন ডিজি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই পুরোনো অভিযোগগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। বরং অনেকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এখন তার অবস্থান আরও শক্ত হওয়ায় পূর্বের অভিযোগগুলো ধামাচাপা পড়তে পারে। এক কর্মকর্তা বলেন, “যে অভিযোগগুলো তদন্তের পর্যায়ে যাওয়ার কথা ছিল, এখন সেগুলো ফাইলবন্দী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।”
মন্ত্রণালয়ের ভেতরের আরেকটি সূত্র জানায়, নিয়োগের আগে থেকেই প্রশাসনের একটি অংশ বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষ সোহেলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, যারা তার পদোন্নতিতে নীরব সমর্থন দিয়েছিল। অন্যপক্ষ এই নিয়োগকে ‘বার্তা’ হিসেবে দেখছে—যেখানে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও উচ্চপদে যাওয়া সম্ভব।
এদিকে, কিছু কর্মকর্তা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়ে। তাদের আশঙ্কা, অতীতে যাঁরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তারা এখন বদলি বা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে পারেন। এতে করে মাউশির ভেতরে ভীতির সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, সোহেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য যাচাই চলছিল। তবে এখন তিনি শীর্ষ পদে থাকায় সেই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে এগোবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কাউকে শীর্ষ পদে বসানো হলে সেটি পুরো ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে যায়।”
শিক্ষাবিদদের একাংশও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, মাউশির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিতর্কিত পটভূমি থাকা কেউ সেই দায়িত্বে এলে পুরো ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে সব দৃষ্টি এখন নতুন ডিজির কর্মকাণ্ডের দিকে। তিনি কীভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং অতীতের অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেন কিনা—সেটিই নির্ধারণ করবে এই বিতর্ক সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।