বিশেষ প্রতিনিধি: অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং আবাসন খাতকে ব্যবহার করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার অভিযোগে একসময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারিতে ছিলেন এনভয় গ্রুপ ও শেলটেক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু দীর্ঘ অনুসন্ধান ও বিভিন্ন আর্থিক নথি সংগ্রহের পরও সেই তদন্ত শেষ পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে থেমে যায় এবং অভিযুক্তরা কার্যত অব্যাহতি পান বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুদকের একাধিক সূত্রের দাবি, কুতুবউদ্দিন, তার স্ত্রী রাশিদা আহমেদ, ছেলে তানভীর আহমেদ ও মেয়ে সুমাইয়া আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতির এক পর্যায়ে পুরো প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো অভিযোগ করছে, দুদকের তৎকালীন কিছু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী মহল এবং সুবিধাভোগী একটি চক্রের সমন্বয়ে তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। পরবর্তীতে অভিযোগ নিষ্পত্তির নামে অভিযুক্তদের অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য
একসময় ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা কুতুবউদ্দিন আহমেদ বর্তমানে টেক্সটাইল, সিরামিক, আবাসনসহ ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের মালিক। গত দেড় দশকে তার সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, শেলটেকের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম দাম দেখিয়ে ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস হস্তান্তরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে একদিকে কর ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে কালো টাকা বিনিয়োগকারীরাও সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ।
অনুসন্ধান সূত্রে উঠে এসেছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক ইউনিট বিক্রির ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্য গোপন করে দলিলে কম মূল্য প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। একটি আলোচিত ঘটনায় গুলশানে প্রায় ১৩ কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাটের দলিল মূল্য দেখানো হয় মাত্র সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
অর্থ পাচারের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আবাসন ব্যবসার আড়ালে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। কুতুবউদ্দিন পরিবারের নামে পর্তুগাল ও দুবাইয়ে বিনিয়োগ এবং ব্যাংক হিসাব থাকার অভিযোগও অনুসন্ধান পর্যায়ে উঠে আসে। দুবাইয়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে গোল্ডেন ভিসা গ্রহণের বিষয়টিও অভিযোগপত্রে উল্লেখ ছিল বলে সূত্র দাবি করেছে।
এছাড়া অবৈধ অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের জন্য একটি হুন্ডি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের অভিযোগও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের নজরে এসেছিল বলে জানা গেছে।
সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ
এদিকে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায় যখন একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম কুতুবউদ্দিন পরিবারের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং কথিত অর্থের বিনিময়ে দুদকের অব্যাহতি পত্র ম্যানেজ করার অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে এরপর অপপ্রচার, চাপ সৃষ্টি এবং আইনি হয়রানির চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাংবাদিক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ ঠেকাতে বিভিন্নভাবে ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
পুনঃতদন্তের আভাস
দুদকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কুতুবউদ্দিন পরিবারকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি কমিশনের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে এবং অব্যাহতি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রমাণ মিললে পুনরায় অনুসন্ধান বা তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
সূত্রটি আরও জানায়, পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের সময় সংগৃহীত নথি, ব্যাংক হিসাবের তথ্য এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তর সংক্রান্ত অভিযোগগুলো পুনরায় পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।
দুদকের নথিতে কী আছে?
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কুতুবউদ্দিন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য দুদক সদর দপ্তর থেকে একজন সহকারী পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হিসাবের বিবরণ চাওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানের জন্য সংগৃহীত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি এখনও দুদকের সংরক্ষণাগারে রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে: দুর্নীতিবিরোধী কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনুসন্ধান কেন থেমে গেল, কারা প্রভাব খাটিয়েছিল, কী ভিত্তিতে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল এবং তদন্তে সংগৃহীত তথ্যের পরিণতি কী হয়েছে, এসব প্রশ্নের জবাব জনস্বার্থেই প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, কুতুবউদ্দিন পরিবারকে দেওয়া অব্যাহতির পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের ব্যবস্থা করা উচিত।