বরিশাল প্রতিনিধি:
৫ই আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ছাত্রলীগ এবং ২০২৫ সালে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সাবেক ছাত্রদল নেতা কামরুলের পুরো পরিবার এলাকা ছাড়া। এলাকায় ফিরলেই এই ছাত্রনেতার জীবন সংশয়।
রাজনৈতিক বাস্তবতা, একাধিক প্রত্যয়নপত্র, থানায় দায়ের করা অভিযোগ এবং পারিবারিক বক্তব্যে উঠে এসেছে এক গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতা। বরিশালের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোঃ কামরুল আলমের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন তার জীবনের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তিনি হুমকি ও সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে ৫ই আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগের পতনের পর এবং পরবর্তীতে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষণার পর এই আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও নথিপত্র অনুযায়ী, কামরুল আলম ছাত্রজীবন থেকেই বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এ বিষয়ে প্রাপ্ত নথির মধ্যে রয়েছে থানায় দায়ের করা একটি অভিযোগপত্র, একটি সাংগঠনিক প্রত্যয়নপত্র এবং একটি স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয় সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র, যেখানে তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বর্তমান নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তার দেশে অবস্থান নিরাপদ নয় বলে জীবননাশের বাস্তব আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকেও একই ধরনের আশঙ্কার কথা বারবার প্রকাশ করা হয়েছে। কামরুল আলমের বড় ভাই রেজাউল আলমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে তাদের বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয়েছে এবং অচেনা নম্বর থেকে নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে, যার ফলে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তাদের গ্রামের বসতবাড়িতে একাধিকবার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে বাড়িটি বসবাসের জন্য নিরাপদ পরিবেশ হারিয়েছে। একই সময়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে মত পরিবর্তনে বাধ্য করার চেষ্টাও করা হয়েছে বলে জানা যায়। বসতবাড়িকে কেন্দ্র করে বারবার হামলা ও ভাঙচুরের এসব ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং এই পরিস্থিতির জন্য কামরুল আলমের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকেই দায়ী করা হচ্ছে।
ছোট ভাইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা এবং একের পর এক এসব হামলার ঘটনা পরিবারের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলেছিল বলে জানা গেছে। এই মানসিক চাপের কারণে তাদের বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, যা পরবর্তীতে তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এলাকার ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় একাধিকবার সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি, যার ফলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে এবং পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতাদের দেওয়া প্রত্যয়নপত্রেও একই ধরনের সতর্কতা উঠে এসেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কামরুল আলমের দেশে ফেরা বা অবস্থান করা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান নয়।
স্থানীয় ৮ নং চাঁদপুরা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক আলম লিটনের বরাতে জানা গেছে, অতীতে গণতান্ত্রিক ধারায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন কামরুল আলম এবং ছাত্র রাজনীতিতে বরিশালের পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুরো পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন এবং কামরুলের পুরো পরিবার বর্তমানে রাজনৈতিক কারণেই গ্রামছাড়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যার পর থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয় বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র উল্লেখ করেছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালে মূল দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়েও অনুরূপ পদক্ষেপের কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা পূর্বে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে যারা স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছেন।
বর্তমানে প্রাণনাশের আশঙ্কায় কামরুল আলম যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মতে, দেশে ফেরার মতো নিরাপদ পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে ঘটে যাওয়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাই প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তার রাজনৈতিক সহকর্মীরাও মনে করেন, চলমান অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে তার দেশে প্রত্যাবর্তন জীবনহানির কারণ হতে পারে বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানান তার মা এবং বড় ভাই।
বাস্তবতা ও নথিপত্র, প্রত্যয়নপত্র এবং পরিবারের বক্তব্যে একটি বিষয়ই ইঙ্গিত করছে—বর্তমান বাস্তবতায় কামরুল আলমের দেশে ফিরে আসা তার জন্য মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।