• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৭ অপরাহ্ন

সেই আলকাছ মল্লিককে বনদস্যু বললেন জিয়াউলের বোন!

Reporter Name / ৪৫ Time View
Update : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: আলকাছ মল্লিককে বনদস্যু বলে দাবি করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বোন ও তার আইনজীবী নাজনীন নাহার। তার বক্তব্য, আলকাছকে জিয়াউল চিনতেন না। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে অন্তত দুজন সাক্ষী আলকাছকে র‍্যাবের সঙ্গে নৌযান চালানোর কাজে যুক্ত একজন মাঝি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সাক্ষীদের অভিযোগ, র‍্যাবের অভিযানে ব্যবহৃত নৌকার মাঝি হিসেবে কাজ করার কারণে আলকাছ নদীতে নিয়ে বন্দিদের হত্যা ও ‘গলফ অপারেশন’ সম্পর্কে তথ্য জানতেন। এ কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়াউল আহসান। পরে র‍্যাবের পরিচয়ে ফোন করে ডেকে নেওয়ার পর আলকাছ নিখোঁজ হন বলে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন সাক্ষীরা।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাজনীন নাহার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম ও হত্যার অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিষয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

নাজনীন নাহার বলেন, ‘আলকাছ মাঝি ছিলেন একজন বনদস্যু। তার ভাই আব্বাস মল্লিকও বনদস্যু ছিলেন।’ তার ভাষ্য, ২০১৮ সালে সরকার বনদস্যুদের পুনর্বাসনের সময় আলকাছকে বরিশালের র‍্যাব-৮-এ মালির চাকরি দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সেই চাকরি ছেড়ে এলাকায় ফিরে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন।

নাজনীন বলেন, র‍্যাব-৮-এ চাকরির সময় আলকাছ মাসে অন্তত ১৫ হাজার টাকা বেতন ও খাবার পেতেন। তাহলে সেই চাকরি ছেড়ে তিনি দিনমজুরের কাজ করতে গেলেন কেন—এ প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, এর কারণ আলকাছ তখনো বনদস্যুতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার দাবি, জিয়াউল আহসান ওই আলকাছকে চিনতেন না।

তবে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষীদের জবানবন্দিতে আলকাছের পরিচয় ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন বক্তব্য উঠে এসেছে।

জিয়াউলের নির্দেশের দাবি সাব্বিরের
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. সাব্বির রহমান ওসমানী গত ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান দাবি করেন, ২০১১ সালের জুনে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে আলকাছ মাঝির বিষয়ে জানতে চান। তিনি জিয়াউলকে জানান, আলকাছ সম্পর্কে তার তেমন কিছু জানা নেই। তবে আলকাছ ‘গলফ’ অভিযানে নৌকা চালানো মাঝিদের একজন ছিলেন বলে জানান তিনি।

সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, আলকাছকে নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা এবং তার বেতন-ভাতার বিষয়গুলো র‍্যাব-৮-এ সংযুক্ত ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা দেখভাল করতেন। এ কথা শুনে জিয়াউল কিছুটা বিরক্ত হন বলে দাবি করেন তিনি।

সাব্বির বলেন, জিয়াউল তাকে জানান, আলকাছ চরদুয়ানী বাজারে ‘গলফ অপারেশন’ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বলে বেড়াচ্ছেন, যা র‍্যাবের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এরপর জিয়াউল তাকে আলকাছকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ দেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাব্বির।

তার ভাষ্য, নির্দেশটি শোনার পর তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার অনুরোধ করেন। একপর্যায়ে জিয়াউল বলেন, ‘থাক, লাগবে না।’

র‍্যাবের পরিচয়ে ডেকে নেওয়ার পর নিখোঁজ
সাব্বির রহমানের জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই ঘটনার আনুমানিক এক সপ্তাহ পর র‍্যাব-৮ এ তার অধিনায়ক তাকে দ্রুত অফিসে যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর অধিনায়ক কয়েকজনকে আলকাছের পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।

আলকাছের স্ত্রী অধিনায়ককে জানান, চার-পাঁচ দিন আগে জিয়াউল আহসানের কথা বলে মোবাইল ফোনে আলকাছকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আলকাছ স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, জিয়াউল তাকে ডেকেছেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না এবং তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

সাব্বির বলেন, পরিবারের সদস্যদের কথা শুনে তার ও অধিনায়কের আলকাছের পরিণতি সম্পর্কে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। অধিনায়ক নিখোঁজ আলকাছকে খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে আলকাছ ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সঙ্গে কাজ করতেন উল্লেখ করে তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি র‍্যাব সদর দপ্তরকে জানানোর পরামর্শ দেন। পরে পরিবারটিকে কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিদায় করা হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

ভাই আব্বাসের জবানবন্দিতেও একই অভিযোগ
আলকাছের ভাই আব্বাস মল্লিকও গত ২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ভাই আলকাছ র‍্যাবের সঙ্গে নৌযান চালানোর কাজে যুক্ত ছিল।’

আব্বাসের জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১১ সালের মাঝামাঝি র‍্যাবের পরিচয়ে ফোন করে আলকাছকে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়। ফোনে বলা হয়েছিল, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছে।’ এরপর সেদিন দুপুরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আলকাছ আর ফিরে আসেননি।

আব্বাস বলেন, সন্ধ্যা ৭টা বা ৮টার দিকে আলকাছের স্ত্রী তাকে ফোন করে জানান, আলকাছের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় তাকে খুঁজতে থাকেন। খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র‍্যাব কার্যালয়েও গিয়ে তার সন্ধান করা হয়। কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি।

পরে পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। আব্বাসের অভিযোগ, জিডিতে জিয়াউল আহসান ও র‍্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানানো হলেও পুলিশ তা করেনি।

নৌপথে বন্দিদের হত্যার বর্ণনাও দেন আব্বাস
আব্বাস মল্লিক তার জবানবন্দিতে ২০১০ সালে র‍্যাবের অভিযানে বন্দিদের হত্যার অভিযোগও তুলে ধরেন।

তার দাবি, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে নৌকায় তোলা হতো। পরে গভীর নদীতে নিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। এসব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান সরাসরি অংশ নিতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আব্বাসের বর্ণনা অনুযায়ী, র‍্যাব সদস্যরা চরদুয়ানী ও কাঠালতলী এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। অভিযানের জন্য স্থানীয় বোট মালিকদের নৌকা দিতে বলা হতো। রাতে মাইক্রোবাসে করে হাত ও চোখ বাঁধা বন্দিদের আনা হতো। তাদের সঙ্গে থাকত সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা। পরে মাঝিদের নৌকা চালিয়ে বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে যেতে বলা হতো।

সাক্ষীর দাবি, গভীর পানিতে বন্দিদের নৌকার নির্দিষ্ট অংশে নিয়ে গুলি করা হতো। এরপর তাদের গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

আলকাছের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গে আব্বাস বলেন, তার ভাই র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাজারে আলোচনা করতেন। এ কারণে অন্য বোটমালিকেরা তাকে সতর্ক করে বলতেন, র‍্যাব তার ওপর ক্ষুব্ধ। পরে র‍্যাবের পরিচয়ে ফোন পাওয়ার পর আলকাছ বাড়ি থেকে বের হন। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি।

তবে আলকাছের পরিচয়, র‍্যাবের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে জিয়াউল আহসানের পক্ষের আইনজীবী নাজনীন নাহার ও ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষীদের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category